ক বি সু স্মে লী দ ত্ত


সুস্মেলী দত্ত


সুস্মেলী দত্ত মূলত নয়ের দশকের কবি। জন্ম:-১৯৬৯সাল।এপর্যন্ত প্রকাশিত মোট এগারটি কাব্যগ্রন্থ।সর্বপ্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বপ্নের রং নীল' প্রমা থেকে বেরিয়েছে। এপর্যন্ত সর্বশেষ প্রকাশিত কবিতার বইয়ের নাম 'মৃত জোনাকির টিপ'। প্রকাশক সিগনেট। কবিতা ছাড়াও ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, নাটক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৬ সালে 'অবগাহনের শেষে' কাব্যগ্রন্থের জন্য 'উৎসব' সম্মান, ২০১১–এ মেদিনীপুর থেকে কবি নিত্যানন্দ পুরস্কার, ২০১৭–এ স্রোতস্বিনী সম্মান, বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার, ২০১৮–এ সিগনেট থেকে প্রকাশিত 'রোমিওচরিত' কাব্যগ্রন্থের জন্য মেদিনীপুর থেকে নিবেদিতা স্মারক সম্মান, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার, এবং সম্প্রতি বাংলা কবিতা একাদেমির তরফ থেকে 'কবিতা সিংহ পুরস্কারে' সম্মানিত। এই বছর বইমেলায় ওঁর সাম্প্রতিকতম একটি নাটকের গ্রন্থ "নাট্যসমগ্র- এক "বিন্দু বিসর্গ প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে।


@কবির সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে


যে মেয়েটি পুড়ে গেল,তার নাম বই (আমার মেয়ে; মল্লিকা সেনগুপ্ত)


কবি-প্রাবন্ধিক সুস্মেলী দত্ত


‘কেউ বলেন নারীবাদ, ওরে বাবা!’


যাঁরা এলেবেলে তাঁদের অজ্ঞানতায় আমার হাসি পায়। মানুষজাতির অর্ধেক ক্ষেপে উঠলে কি হতে পারে তাঁরা বুঝতে পারছেন না। যাঁরা বলেন ‘ওরে বাবা’ তাদের জানা দরকার, নারীবাদ মানেই ডিভোর্স নয়, নারীবাদ মানেই দশটা ছেলের সঙ্গে শোয়া নয়, নারীবাদ মানে লেসবিয়ানিজমও নয়, নারীবাদ মানে কখনই সন্তানের অবহেলা নয়, সমাজ ছারখার করা অনাসৃষ্টি নয়। কিন্তু নারীবাদ মানে প্রশ্ন তোলা, অবিরাম, অনিঃশেষ প্রশ্ন। 


পক্ষপাতের বিরুদ্দেই নারীবাদ প্রশ্ন তোলে। সেই প্রশ্ন শুধু যৌন মূল্যবোধের ক্ষেত্রেই নয়, সর্বক্ষেত্রে। 


কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মান’–পড়ে সেদিন চমকে উঠেছিলাম। একথা তো আমার মনের কথা – কেমন করে কবি বুঝলেন, যে এই কথাগুলিই আমি বারবার সকলকে, বিশেষত সমাজকে আর আমার আশেপাশের মানুষজনকে এতদিন বোঝাতে চেয়েছিলাম। বলতেও চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। কেউ যেন পেছন থেকে আমার কলমকে এতদিন টেনে রেখেছিল – অথবা সাহস হয়নি হয়ত। তবে সান্ত্বনা এটাই যে, আমার বা আমাদের, মানে মেয়েদের মনের কথা কবি খুব সুন্দরভাবে এখানে ব্যক্ত করেছেন। সেদিন সত্যি সত্যিই স্বীকার করেছিলাম মনে মনে, যে কবিরা সত্যদ্রষ্টা, দূরদর্শী। 


মল্লিকাদির কলম এরকমই। যা বলেন সামনে সোজাসুজি, স্পষ্ট। শক্তিশালী প্রবন্ধের পাশাপাশি কবিতাতেও এই লেখিকা তাঁর ছন্দ, বাক্য, শব্দচয়নের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য কিভাবে সাধারণ মানুষের উপযোগী সপ্রতিভভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। 


কবি ‘সীতায়নে’ লিখেছেন, 


‘নারীর জয়ায়ুজমি লাঙল চাইছে 

যদি অসমর্থ হই, ভাড়া করে নিয়োজিত করে 

অথবা যে কোনভাবে বীজ এনে দেব।’


‘স্বামীর কালো হাত’ থেকে নেওয়া নিন্মোক্ত কবিতাটি দেখুন – 


‘মশারি গুঁজে দিয়ে যেই সে শোয় তার 

স্বামীর কালো হাত হাতড়ে খুঁজে নিল

দেহের সাপব্যাঙ, লাগছে ছাড় দেখি

ক্রোধে সে কালো হাত মুচড়ে দিল বুক

বলল, শোন না শ্বেতা, ঢলানি করবে না…’


যখন কোন কবি এভাবে নারীদের দুঃখ, বেদনা, অভিমানের কথা ভাষায় প্রকাশ করেন, ব্যক্ত করেন তখন স্বীকার করে নিতেই হয় যে এই সংবেদনশীল কবি নিবিড়ভাবে নিজের মতো নিজের মধ্যে মেয়েদের দুঃখটাকে নিংড়ে নিতে জানেন, শুধুমাত্রই বাইরের উপলব্ধি দিয়ে নয়, মন থেকে তাঁদের অনুভব করেন। তা কেবলমাত্র পাশে থেকে নয়, নিজেকে তাদের একজন বলেই মনে করেন। তাই বোধহয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পাঠক এই কবিকে সানন্দে তাঁর সঙ্গে রিলেট করতে করতে ক্রমশ দ্রবীভূত হয়ে যান। এটাই বোধহয় মল্লিকা সেনগুপ্তর কবিতার মূল ভিত্তি। 


আশির দশকের কবিদের কবিতার অন্যতম বিশেষত্ব হল, এঁদের মধ্যে অনেকেরই কবিতার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ব্যাঙ্গোক্তি রয়েছে। কেউ সরাসরি তাঁদের কবিতায় কেউ বা ইঙ্গিতের সাহায্য নিয়েছেন। ব্যক্তি সচেতন, সমাজ সচেতন এই কবি পেশায় ছিলেন সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা, সে কারণেই বোধহয় সমাজের মধ্যে অধিকারবোধের ভারসাম্যহীনতা ওঁকে বেশিমাত্রায় পীড়িত করেছিল। 


উদাহরণস্বরূপ এই কবিতাটি – 


‘নারীর জরায়ুভূমি লাঙল চাইছে, 

যদি অসমর্থ হই, ভাড়া করে, নিয়োজিত করে 

অথবা যে কোনওভাবে বীজ এনে দেব, কুন্তী ওগো শস্যদবী,

আমার দুহাত তুমি ধ্যানে ভরে দাও।

রাজ্যসুখ ধনমান কিছুই চাই না 

চাই না কন্যার জন্ম, আমাদের পুত্র চাই শুধু’।(পাণ্ডুর পুত্রাকাঙ্খা)


‘কন্যাবর্ষে’ কবিতাটি তো সর্বজনবিদিত। তবু আরেকবার এই কবিতাটি উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না।


‘কন্যাশিশুবর্ষ জুড়ে ভ্রুণ নির্ণয়ের খেলা চলে 

তারপর ঝরে পড়ে ভ্রুণপুষ্প গর্ভের কান্নায় 

তার প্রতিবাদ হোক আমার জরায়ু 

আসুক আমার মধ্যে প্রতিভূ আমার 

তুলতুলে অথচ স্বাধীন, ছোট্ট এক শিশুকন্যা 

খরজ্যৈষ্ঠে যে আমায় ছায়া এনে দেবে।’


যেদিন প্রথম পড়েছিলাম কবিতাটি, সারা শরীরে কেমন যেন রোমাঞ্চ হচ্ছিল। একথা তো আমিও বলতে পারতাম, কেন বলিনি এতদিন? মনের মধ্যে পুষে রাখা যত মান অভিমান আর দুঃখগুলো আমাকে তিষ্ঠোতে দিচ্ছিল না। ঠিক তখনই নিজেকে আবিষ্কার করলাম, আমি কতটা আমার কলমের কাছে অসহায়। কেন মল্লিকা সেনগুপ্ত, মল্লিকা সেনগুপ্তই হয়ে উঠেছিলেন তার প্রচ্ছন্ন কারণটাও ধীরে ধীরে যেন ভোরের আলোর মতোই প্রস্ফুটিত হচ্ছিল।

মল্লিকা সেনগুপ্ত ওঁর ‘পুরুষ নয় পুরুষতন্ত্র’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘যখন লিখতে বসি, একটি মানুষ হিসেবে আমার অস্তিত্বকে ভুলে যাব কী করে! আর ভুলবই বা কেন? প্রথম বাঙালি মেয়ে কবি খনার জিভ যখন কেটে দেওয়া হয়, সে ব্যথা আমারও গায়ে লাগে। শাহবানুর খোরপোষের দাবী প্রত্যাখ্যাত হলে, সেই অপমান আমাকেও বাজে। এইসব বেদনা, অপমান, বঞ্চনার কশাঘাত থেকেই আমার সৃজন আমার কল্পনা। এরাই আমাকে লিখিয়ে নেয়। যন্ত্রণা থেকে কবিতার জন্ম হয়।’


আমার নিজের জীবন দিয়ে দেখেছি এই কথার সত্যতা কতটা। যখন লিখতে বসি, তখন সেলুলয়েডের পর্দায় ছবির মতো ঘটনা প্রবাহগুলো মনের ক্যানভাসে ভাসতে থাকে একের পর এক। হয়ত কখন জানি না, অতীতের কোন ঘটনা বা কল্পনা মনে গহীনে দাগ কেটেছিল, কলমের ডগায় আবার কখন তা জ্যান্ত হয়ে উঠল কিভাবে, তা ভাবতেও শরীরের শিহরণ জাগে। হতে পারে, সেই পরিস্থিতি বা মুহূর্তগুলি আমার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের পক্ষে সেই সময় অনুকুল ছিল না, এখন আমার প্রৌঢ় দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিকুলতার সঙ্গে ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব আমাকে আগের থেকে অনেক শানিত করেছে – তাই ঢাল তরোয়াল নয়, লেখনীর মাধ্যমেই গর্জে ওঠা আমার বুলেট, কামান আর পারমানবিক অত্যাধুনিক অস্ত্র। তখন কোথায় লাগে শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র, আর বিজ্ঞানীদের সাতসতেরো এক্সপেরিমেন্টের বহর। 


এ প্রসঙ্গে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি। জন্মসূত্রে এমন এক পরিবারে আমার বড় হয়ে ওঠা, যেখানে পুরুষ আধিপত্য প্রায় শতকরা একশোভাগ। মাকেও দেখেছি বাবার সব কথা মুখ বুঁজে মেনে নিতে। বাড়ির মহিলা মানে, ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের’ খাওয়াদাওয়া, লাইফস্টাইল, পোশাক পরিচ্ছদ সবকিছুই ছিল পুরুষ আধিপত্যের আড়ালে। স্বাধীনতা দূরে থাক, এর হাওয়াটুকুও তাঁদের গায়ে লাগা বারণ। তাড়াতাড়ি কোনমতে পড়াশুনা শেষ করে বিয়ে’ নামক একটা প্রতিষ্ঠানের গোলামি করা ছাড়া তাঁদের আর কিছুই করতে অনুমতি দেওয়া হতো না। পিতৃতন্ত্রের কঠোর বেড়াজালে আমাদের তখন নাভিশ্বাস অবস্থা! এমন অবস্থায় পালে বাতাস লাগল। নৌকো নড়েচড়ে বসল। ঐ তো ঈশান কোনে ঝড়ের পূর্বাভাস! তখন মনে হলো ভরাডুবি হয় হোক, নৌকোয় সওয়ারী হতেই হবে। বেরিয়ে পড়লাম নিরুদ্দেশের ঠিকানায়। 


–এরপর? 


জানিনা, উত্তরহীন আমি সেই সেদিন থেকেই এগিয়ে চলেছি, এগিয়ে চলেছি শুধুই, ঠিক তখনই কবি তোমার হাত ধরা। সিমন দ্য বোভেয়ার বলেছেন, ‘মেয়েদের বিষয়ে যে সমস্ত মিথ রচনা করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের ভুলিয়ে রাখে, সেই মিথগুলি ভাঙতে হবে। মেয়েদেরও প্রয়োজন আছে সত্তা সন্ধানের। ভূমিকাসর্বস্ব জীবনযাপনের বাইরে নিজের–হয়ে–ওঠা পথ খুঁজে নেওয়া প্রয়োজন। তাহলে তাঁরা সত্য অর্থে স্বাধীনভাবে স্বামী কিংবা সন্তানের সঙ্গে সম্বন্ধ রচনা করতে পারবেন। স্ত্রী হিসেবে মা হিসেবে নিজেরা যদি স্বাধীনতা না হারান তাহলে স্বামীকে কিংবা সন্তানকেও তাঁরা বেঁধে রাখতে চাইবেন না।’

সিমোনের প্রতিটি কথার অনুরনন যেন মল্লিকা সেনগুপ্তর কবিতার মধ্য দিয়ে। তবে হ্যা, মল্লিকা সেনগুপ্ত যে শুধুমাত্র নারীবাদী কবি হিসেবেই সফল তা কিন্তু নয়। ওঁর কবিতায় উঠে এসেছে যেমন প্রেম, যৌনতা, তেমনি নিরাশা, অস্থির সময়ের দলিল, অনিশ্চিত জীবনকেও উনি সুন্দর ও পরিশীলিত ভাবে কাব্যে গেঁথেছেন। ‘মাছের চাবুক ঊনিশ শতক’ কবিতায় উনি লিখেছেন – 


‘আগুন বললেন, এমন বাতুলতা রমনী ভুলে যাও

জন্ম কুলীনের বংশে কন্যার 

জীবনভোর তাকে নর্মসহচরী অথবা ধাত্রীর

ভূমিকা নিতে হবে। প্রণয় বিষ তার।’


সাতমাত্রার ছন্দে কবির কলমে উঠে এসেছে বুঝি নারী সত্তার দীর্ঘশ্বাস। আশি দশকের গোড়ায় ওঁর লেখা ‘চল্লিশ


চাঁদের আয়ু’, ‘আমি সিন্ধুর মেয়ে’, ‘হাঘরে ও দেবদাসী’ কাব্যগ্রন্থগুলি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরে যখন ওঁর লেখার সঙ্গে আরও পরিচিত হতে শুরু করলাম তখন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম। এর অর্থই হল একজন কবির কবি হিসেবে কতটা সার্থক যে, তরুণ প্রজন্মরাও ওঁর সৃষ্টিকর্মে সেসময় একেবারে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ একথাও বলত যে, আমি মল্লিকা সেনগুপ্তর মতো লিখতে চাই। বলা বাহুল্য, আমিও তাদের মধ্যে একজনই ছিলাম।  

মাত্র কয়েকদিন, কয়েকমাস, কয়েকবছর। দেখতে দেখতে কেটে গেল সময়গুলো। ফিরে যাই সামান্য অতীতে। ১৯৬০ সালে জন্ম এই শক্তিশালী কবির। তারপর ২০০৫ সাল থেকে শুরু হয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তারপর সকলকে কাঁদিয়ে ইহলোক ত্যাগ করলেন কবি ২০১১এ। মাত্র একান্ন বছর বয়স তখন। তাঁরই মধ্যে কত লেখা গদ্যে পদ্যে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে পেয়েছি ওঁকে, কিন্তু আবিষ্কার করতে পেরেছি কতটুকু? জানি না। শুধু জানি, আমরির মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা মানুষটাকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেমন আছ দিদি?

বলেছিলেন ভালো। নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গিয়েছিলাম পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে। ভেবেছিলাম, সত্যিই বোধহয় দিদি ভালো হয়ে উঠবেন। কিন্তু ওই যে একটা কথা আছে, ‘মানুষ যা চায় তা পায় না…’ সেটাই নিষ্ঠুরভাবে একদিন সত্যি হয়ে উঠল। সব মিডিয়া জুড়ে তখন একটাই খবর… নেই, নেই. তিনি নেই। আর আমি সেদিন বোকা বাক্সের দিকে ভ্যাবলা হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছি, সব মিথ্যে, সব। যতই দিদির ছবিগুলো টিভির পর্দায় একের পর এক ভেসে উঠছিল, ততই অতীতের।


স্মৃতির অ্যালবাম থেকে স্মৃতিগুলো টুপটাপ করে করে পড়ছিল আমার আঙিনায়। মনে পড়ে যাচ্ছিল কতকথা


এই তো সেদিন, লাহাবাড়ির পারিবারিক দূর্গা পুজোয় তোমায় নিমন্ত্রণ করে এলাম, তখন সবে সবে সাহিত্য জগতে পা রেখেছি। একজন কবি সাহিত্যিকও সেই পুজোয় এলেন না – কারণ, তাঁদের কাছে আমি তখন ছিলাম অপরিচিত। কিন্তু তুমি, সুবোধদা এসেছিলে, সুবোধদা বলেছিলেন, মল্লিকা বলল, মেয়েটা অমন করে বারবার নেমন্তন্ন করে গেল, আমরা যাব না, তা কি হয়?

ভাবাই যায় না। আজকাল মানুষ এমন স্বার্থান্বেষী হয়ে গেছে যে, তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পর্ক স্থাপনে কর্তব্যতো দূরের কথা সামান্য ভদ্রতাটুকু আশা করা ভার। কিন্তু ধ্রুবতারার গায়ে কলঙ্ক লাগে না। লাগতে নেই, কারণ, সে যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সবার উপরে। তাই তো তুমি কতক্ষণ পুজোবাড়িতে আমার সঙ্গে কাটিয়ে দিলে। সেসব দিনটার কথা কি কখনও ভুলতে পারি?


আর একবার ‘সানন্দা’–র জন্য লেখা দিতে গিয়েছিলাম। কী কাঁচা হাতের হিজিবিজি লেখা – তাও আবার হাতের লেখায়। মল্লিকাদি গম্ভীর মুখে বুঝিয়ে দিলেন, শব্দের সামান্য হেরফেরে একটা সাধারণ কবিতা কিভাবে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। এ আমার বহু জন্মের প্রাপ্তি। আজও যখন কোনসময় একলা বসে থাকি, দিদিকে শেষ দেখা হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা, ওঁর ‘ভালো আছি’ শব্দগুলো যেন বাতাসে ভেসে ভেসে কানের কাছে অনুরনিত হতে থাকে। ভাবি, তখন দিদি শারীরিকভাবে ভালো ছিলেন না সত্যিই, কিন্তু আজ আমরা আমাদের অবস্থানে একবিংশে দাঁড়িয়েও কি ‘ভালো আছি’ বলতে বলতে, ভাবতে ভাবতে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছি না! ভালো কে আছে – তুমি আমি, আপনারা, তোমরা – নাকি কেউই নয়। পৃথিবীটা মনে হয় সেই লাই ডিটেক্টর মেশিনের সামনে বসে থাকা কুর্সির মতো। আমরা একের পর এক মিথ্যে বলছি, সত্যি বলছি কিন্তু বলছি। প্রশ্নবোধক চিহ্নের ছায়া আমাদের পিছু ছাড়ছে না। 

মল্লিকাদিও কী সেদিন হ্যা অথবা না–এর দোলাচলের মধ্যে ছিলেন? কিংবা হয়ত ভেবেছিলেন, উনি আরও কিছুদিন… নাকি স্নেহবশতঃ আমার মতো অর্বাচীনকে সত্যকথন করে খামোখা বিব্রত করতে চাননি, কে জানে! 

আরও আরও অনেক কিছু কথা… যা মনের গভীরে ঝিনুকের পেটে মুক্তোর মতো আটকে আছে। নাই বা বললাম সেসব। আমি জানি মল্লিকাদি, তুমি যেমন তোমার ব্যক্তিত্ব নিয়ে সেদিনও অটুট ছিলে, আজও থাকবে – সকলের মনে। কিছু কথা উহ্য থাকাই শ্রেয়। আমার প্রিয় কবির সঙ্গে কাটানোর কিছু মুহুর্তগুলো আমার সম্পদ। এখন কানে বাজছে ‘খনাজন্ম’ কবিতার শেষ দুটো পংক্তি – 


‘আবার আসিব ফিরে, বঙ্গ দেশে গঙ্গাজল বেয়ে

মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দুকান কাটা মেয়ে…’






























Comments

Popular posts from this blog

ক বি ফ টি ক চৌ ধু রী

ক বি- অ নু বা দ ক রু দ্র কিং শু ক