ক বি অ রু ণ পা ঠ ক
অরুণ পাঠক

এই শতাব্দীর সূচনালগ্নের কবি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বারোটি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রশস্তির ভিন্ন রূপ' ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত শেষ কাব্যগ্রন্থ ' হাসি হাসি কান্নার বরফ' প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে কলকাতা বইমেলায়। সম্পাদিত পত্রিকা : সাহিত্যের বেলাভূমি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ স্নাতকোত্তর ও শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রীপ্রাপ্ত।পেশা : শিক্ষকতা। কবিতা লেখা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত।
@'কবির সঙ্গে কবিতার সঙ্গে'
মগ্ন শিকড়ে একা
কবি-প্রবন্ধিক অরুণ পাঠক
কবি দীপক হালদারের কবিতা প্রথম পড়েছিলাম স্কুলে ছাত্রাবস্থায়। ফলতার দীঘির পাড় থেকে প্রকাশিত অরূপ কুমার নস্কর সম্পাদিত জীবন নদীর তীরে পত্রিকায়। খুব ছোট্ট নিটোল বিশুদ্ধ সে কবিতা। তারপর বিভিন্ন পত্রিকার পত্রিকায় তাঁর কবিতা পড়ি ও তাঁর কবিজনোচিত মেজাজ ও মার্জিত রুচির একটা আভাস পাই। কলেজ জীবনে তাঁকে বহুবার ডায়মন্ড হারবার ও সরিষায় ( তাঁর আবাস ও স্কুল) দেখেছি। কেতাদুরস্ত সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পরিহিত তাঁকে দূর থেকে দেখে তাঁর ব্যক্তিত্বের বজ্রকঠিন গাম্ভীর্য ও পরিচ্ছন্ন মেধাবীয়ানার সঙ্গে একটা সম্ভ্রমাত্মক দূরত্ব রক্ষা করতাম। কিন্তু ঘটনার পাকেচক্রে পরবর্তী কালে আমি যখন এম এ পড়ি তখন একদিন জেদ চাপল তাঁর বাড়ি যাব বেলাভূমির জন্য কবিতা চাইতে। বন্ধু শ্যামল হালদারকে নিয়ে এক সকালবেলা প্রথমে সুপ্রকাশ ঘোষ তারপর সুধীর দত্ত ও তারপর দীপক হালদারের বাড়ি। দুরু দুরু বক্ষ অথচ শরীরে এক কৃত্রিম সাহস রেখে দরজায় গিয়ে বললাম দীপক হালদার আছেন? আমার সামনে তিনি তাঁর দীর্ঘ বপু নিয়ে দাঁড়ালেন।
কী চাই?
বললাম আমাদের পত্রিকার জন্য কবিতা।
ভেতরে ঢুকতে বললেন। বসতেও বোধহয়। তারপর নিজ হাতে সরবত বানাতে বানাতে আমাদের ঠিকই কুষ্ঠী জেনে নিয়ে প্রশ্ন করলেন আর কে কে কবিতা দিয়েছেন?
বললাম সুধীর দত্ত। সঙ্গে যোগ করলাম তিনি দুটি কবিতার বইও দিয়েছেন।
কাজ হল। মনে হল পাস করলাম।
তিনি সরবত আমাদের হাতে দিয়ে কবিতা কপি করতে বসলেন।
এই হল কবি দীপক হালদারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তারপর কীভাবে তিনি ক্রমশ দাদা হয়ে উঠলেন। দৈনিক অন্তত ফোনালাপ ও কবিতাকেন্দ্রিক সুবিস্তৃত আলোচনার একটা প্রান্ত তিনি হয়ে উঠলেন আমার কাছে আমি জানি না। তাঁর গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিক প্রশ্রয় আমাকে শিখিয়েছে ব্যক্তিজীবনের সংযম ও কবিজীবনের নিষ্ঠা। কীভাবে নকল আলোর রোশনাই থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয় তাঁকে দেখে শিখেছি।
সেই কবে তিনি লিখেছিলেন —
"তিনি দেশলাই-এ কাঠিটা ঘষে বললেন
এভাবে চললে অচিরেই তাঁর মুখ দেখা যাবে
ফস্ করে আলোটা জ্বলার সাথে সাথে
তাঁর মুখ দেখার জন্য তাকাতেই কাঠিটা নিভে গেল
গলা উঁচু করে ফের তিনি বললেন
আজ বড়ো অন্ধকার অন্ধকারে আরও বহু মুখ আছে"(মুখ)
এই কবিতায় এক অপার্থিব রহস্য আছে। যিনি তাঁর মুখ দেখানোর জন্য দেশলাই কাঠি ঘষতে বলছেন তিনিই কি প্রকারান্তরে আগুন নিভিয়ে দিচ্ছেন? কারণ, তিনি অন্ধকারের সপক্ষ নিয়ে অন্ধকারে বহু মুখের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কবিতাটি সম্পর্কে দীপকদা বলতেন যে কবিতাটি লেখা হলে তিনি তাঁর গুরু তৎকালীন ডায়মন্ড হারবারের বিডিও কবি বাসুদেব দেবকে দেখান। বাসুদেব দেব এ কবিতার ভূয়ষী প্রশংসা করেন। এইভাবে তাঁর একেকটি কবিতা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বলতেন। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা বেশি নয় তাঁর।
যদিও তিনি সত্তরের কবি, তথাপি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। মগ্ন শিকড়ে একা। এরপর ক্রমান্বয়ে—
আকরিক ১৯৯৪
হে অনঙ্গ উত্তরীয় ১৯৯৫
কে তুমি অনন্ত চোখে ১৯৯৬
তোমাকে প্রসন্ন করি ২০০১
নির্বাচিত কবিতা ২০১৫। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর 'সব চলাচল পাঠঘর' নামে কাব্যগ্রন্থ।
দীপকদা একটি সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন উপনিষদের শ্লোক আর ফরাসি কবিতার স্বল্পায়তন গঠন তাঁকে ডীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। তাই তাঁর অধিকাংশ কবিতাই ছোট ছোট শ্লোকের মতো। যেমন —
কারুর সাথেই নয়
নিজের ঘরে নিজের সাথে শুধু
ধূ ধূ দিনে একটি মরুদ্যান
এই এটুকুই চাওয়া নাওয়া-খাওয়া বিহীন
হাঁটা হেঁটে যাওয়া নিজের এ শব ভেঙে
( গান)
জীবন আর উদাত্ত স্বর্গীয় সংবেদ তাঁর কবিতাকে করে তুলেছে এক একটি অমোঘ মন্ত্র যা উচ্চারণে প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততা আসে। আমরা পেয়ে যাই জীবনের অনেক ধারণ।
পথে পথে হুল্লোড়ের সাড়া
তাহলে কি দল বেঁধে
জেগেছে পথের
( পথ)
কিংবা—
সে প্রথম শরীর দেখছে আজ
পাথর খোদিত অনুপম
চক্ষুদানক্রিয়া তার
মন্ত্রমুগ্ধ ক্ষেপণ মুদ্রায় সে জাগাবে তাকে
( পুরোহিত)
বলাই বাহুল্য এসব কবিতা পথচলতি পথিকের মুখে মুখে ফেরার মতো নয়। স্থিতধী, আত্মস্থিত মানুষের অনুভূতিজাত। নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত 'এক্ষণ' এবং অশোক সেন সম্পাদিত 'বারোমাস' পত্রিকার কথা বলতেন দীপকদা যে পত্রিকাগুলিতে তিনি দীর্ঘদিন
কবিতা লিখেছেন। দীপকদার সঙ্গে সময় কাটানো মানেই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন। নতুন নতুন স্বপ্নের উজান। একবার ঠিক হল আমি দীপক দা আর রফিকদা মিলে ডায়মন্ড হারবারে একটা মাসে মাসে অনুষ্ঠান করব। নাম হবে কবিতার সঙ্গে কিছুক্ষণ। হল। প্রথমবার এলেন কবি উত্তম দাশ ও সৌমিত বসু । সঙ্গে আমিও কবিতা পড়লাম।
পরের মাসে এলেন কবি সুজিত সরকার সুধীর দত্ত ও পার্থজিৎ চন্দ। এভাবেই কবি যশোহর রায়চৌধুরী কবি সুবোধ সরকার এলেন। তারপর কিছুটা ভাঁটা পড়ে গেল। আমি একাই উদ্যোগ নিয়ে দীপকদাকে সঙ্গে নিয়ে সাহিত্যের বেলাভূমির নামে দীপকদার বাড়িতে অনুষ্ঠান করতে লাগলাম। সেখানে এলেন কবি সোমব্রত সরকার কবি অভিমন্যু মাহাত কবি সুধীর দত্ত প্রমুখ। দীপকদা আমার এতটা আপন যে তাঁর সঙ্গে একটি দিনও কথা না বলে থাকতে পারতাম না। এখন তিনি অসুস্থ অবস্থায় কলকাতার একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রার্থনা করি তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন।
আর, আমি অপেক্ষায় থাকব টেলিফোনের ওপার থেকে সেই চিরচেনা কন্ঠে "ভাই, বলো" কথাগুলো শোনার জন্য।





Comments
Post a Comment